শিরোনামঃ

মুন্সি আবদুর রউফের বীরত্বগাথা ইতিহাস রাঙামাটির নতুন প্রজন্মের জানা নেই

সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। দেশের সাত শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজন বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক মুন্সি আবদুর রউফের বীরত্বগাথা ইতিহাস রাঙামাটির নতুন প্রজন্মের জানা নেই। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে কেবল বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে প্রশাসন স্বরন করলেও বাকি সময় টুকু অনাদরে পরে থাকে দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের কবরটি। শহীদ ল্যান্সনায়েক মুন্সি আবদুর রউফ দেশের সাত বীরশ্রেষ্টের অন্যতম একজন। তিনি ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল মহান মুক্তিযুদ্ধে রাঙামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। স্বাধীনতা অর্জনের ২৬ বছর পর বিগত আ্ওয়ামীলীগ সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে এ বীরশ্রেষ্টের সমাধি স্থলের সন্ধান মেলে। যুদ্ধকালীন সময়ে মুন্সি আব্দুর রউফের সহযোদ্ধা নানিয়াচরের দয়াল কৃঞ্চ চাকমা নামের একজন ব্যাক্তি লাশের সন্ধান দেন। নিঃস্বার্থ ও নির্লোভ দয়াল কৃঞ্চ চাকমা যুদ্ধকালীন সময়ে নানাভাবে মুক্তি যোদ্ধাদের সহযোগিতা করলেও স্বাধীনতার ৪১ বছর পর তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। munsi abdur rouf kabar
স্মৃতিচারন করতে গিয়ে দয়াল কৃঞ্চ চাকমা জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল তখন স্বাধীনতা যুদ্ধে উত্তাল সারাদেশ। স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত সারাদেশের মানুষ। যুদ্ধ শুরু হয়েছে পুরোদমে। সারাদেশে সর্বত্র। ওইদিন সকাল গড়িয়ে নামে দুপুর। ঝিকঝিক করছিল রাঙামাটির সবুজ পাহাড় ঘেরা কাপ্তাই হ্রদের শান্ত নীল জলরাশি। ঠিক তখনই হঠাৎ শত্র“বাহিনীর কামান ও মর্টারের আওয়াজ গর্জে ওঠে। প্রকম্পিত হচ্ছে শান্ত পাহাড়ী জনপদ। গোলাগুলির শব্দে আকাশ-বাতাসও গর্জে উঠেছে। হ্রদের জলে সৃষ্টি হয় তুমুল আলোড়ন। পাক হানাদার বাহিনীর মূল লক্ষ্য- রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটের চেংগিখালের তীরে গড়ে তোলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ দখল করা। চেংগিখাল বরাবর উত্তর-দক্ষিণ কোণে হ্রদের ছোট একটি দ্বীপে মুক্তিযোদ্ধারা ওই প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। সেখানে শত্র“পক্ষের গতিবিধি নির্ণয়ে মেশিনগানার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্টবেঙ্গল ও ইপিআরের(ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্য ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ।
সবার আগে মুন্সি আবদুর রউফের দৃষ্টি রেখার দিগন্তে ধরা পড়ে তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছিল পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত রণতরী। পাকবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের কোম্পানির অধিক সৈন্য ৬টি তিন ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য ভারি অস্ত্রসহকারে তিনটি লঞ্চ ও দুটি স্পীডবোট যোগে প্রবেশ করে চতুর্দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ঘিরে ফেলে। ওই সময় মর্টার শেল এবং অন্যান্য ভারি অস্ত্রের গোলাবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্ত ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ নিজ অবস্থানে সুদৃঢ় থেকে শত্র“ পক্ষের ওপর তার মেশিনগান দিয়ে প্রবল গোলা বর্ষণ করতে থাকেন। তিনি তার সহযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেন। তারপর মুন্সী আব্দুর রউফ বেরিয়ে আসেন পরিখা থেকে। উপভোগ করতে থাকেন বিজয়ের আনন্দ অনুভূতি। মেশিনগান তুলে ধরে অনবরত গুলি ছুড়তে লাগলেন সরাসরি শত্র“দের বোট লক্ষ্য করে। তার অসীম সাহস ও মেশিনগানের প্রবল গোলার আঘাতে শত্র“ পক্ষের ২টি লঞ্চ ও একটি স্পিট বোটসহ দুই প¬¬াটুন শত্র“ সৈন্যের সলিল সমাধি হয়। বাকি দুই অক্ষত স্পীড বোটের শত্র“সেনা দ্রুত পিছু হটতে থাকে এবং মুন্সী আব্দরু রউফের ওপর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করে। এতে হঠাৎ পাক হানাদারদের একটি মর্টারের গোলা তার ওপর আঘাত করলে সেখানেই ল্যান্সনায়েক মুন্সি আবদুর রউফ শাহাদৎ বরণ করেন।
দয়াল কৃঞ্চ চাকমা আরো জানান, সবাই পালিয়ে যাবার পর অত্যন্ত গোপনে তিনি মুন্সি আব্দুর রউফকে একটি টিলায় করবস্থ করেন। পরে ১৯৯৬ সালের দিকে তৎকালিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকূল ইসলাম (বীর উত্তম) মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থল খুঁজে বের করার নিদের্শ দেন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় আদিবাসী দয়াল কৃঞ্চ চাকমাকে বিডিআর সদস্যরা ছবি দেখালে তারই তথ্যের ভিত্তিতে বিডিআরের রাঙামাটির সদর দপ্তরের জোয়নরা মুন্সি আবদুর রউফের সমাধিস্থল খুঁজে বের করে এবং কবরস্থানে স্মৃতি স্তম্ব নির্মান করে করে। স্বাধীনতার ৪১ বছর ধরে কবরটি নিঃস্বার্থভাবে দেখাশোনা করে আসছেন দয়াল কৃঞ্চ চাকমা। দয়াল কৃঞ্চ চাকমাকে বছরে বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস আসলে জেলা পরিষদ ও বিডিআর কিছু আর্থিক সহায়তা করে বাকি সময়ে তার খবর কেউ রাখে না। মুন্সী আবদুর রউফের সমাধির তত্ত্বাবধান করার বিনিময়ে কিছু মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা পান না বলে জানিয়েছেন দয়াল।

 দয়াল কৃঞ্চ চাকমা

দয়াল কৃঞ্চ চাকমা

একজন বীরশ্রেষ্ঠর দাফন সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন সেই কবরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পথহারা মুক্তিযোদ্ধাদের পথ চিনিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করার স্বীকৃতি হিসেবে দয়াল কৃষ্ণ চাকমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় সংযোজন করার আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়। নানিয়ারচর উপজেলা প্রশাসন ও রাঙামাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু তার পরও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ঠাঁই হয়নি দয়ালের। তাই জীবনের শেস সময় এসে তিনি সরকারের কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন করেছে।
এ প্রসঙ্গে রাঙামাটি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রবার্ট রোনাল্ড পিন্টু বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দয়াল কৃষ্ণ চাকমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে লেখালেখি করেছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এত বছরেও এই কাজটি হয়নি। এটা আমাদের সবার জন্যই আসলে লজ্জার।’
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম না ওঠা কিংবা সরকারি সহায়তা না পাওয়ায়ও কারো প্রতি কোনো অভিমান নেই দয়াল কৃষ্ণ চাকমার। সংসারের শত টানাপড়েনের মধ্যেও মনের আনন্দেই রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধি।
দয়াল বলেন, ‘অনেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু কেউ তো কথা রাখল না। সরকারিভাবে কী পেলাম- কী পেলাম না, তা নিয়ে এখন আর ভাবি না। আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানরাও রক্ষণাবেক্ষণ করে যাবে এই সমাধির।’
উল্লেখ্য বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের পহেলা মে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার সালামতপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন ও মাতার নাম সৈয়দা মুকিদুননেছা বেগম। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮মে তৎকালিন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ সৈনিক পদে যোগদান করেন। তার সৈনিক নাম্বার হল ১৩১৮৭। বিস্ময়কর হলেও সত্য-দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ২৫ বছর বীরশ্রেষ্ট মুন্সি আবদুর রউফের সমাধিস্থল সনাক্ত হয়েছে। তার আগে কেউ তার সমাধিস্থলের খোঁজ জানত না। রাঙামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের কাপ্তাই হ্রদের বুকে চেংগিখালের একটি ছোট ঢিলার ওপর শায়িত বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থলে নির্মিত হয়েছে তার একটি স্মৃতিসৌধ।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 419 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen