শিরোনামঃ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংবাদ সম্মেলনের হুবহু বক্তব্য

সিএইচটি টুডেডট কম ডেস্ক। আজ সোমবার ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অবস্থা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের PCJSSপরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে দেয়া সংবাদ সম্মেলনের হুবহু বক্তব্য

সংবাদ সম্মেলন

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্যবাসীর সাথে কোনরূপ আলোচনা না করে গত ১ জুলাই ২০১৪ তারিখে জাতীয় সংসদে একতরফাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ পাশ করেছে এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন এবং রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ও জনবিরোধী এসব উদ্যোগ গ্রহণের পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীগণ ও জাতীয় পর্যায়ের নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ জানিয়ে আসছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের অব্যবহিত পরে চুক্তির কিছু বিষয় বাস্তবায়িত হলেও এখনো চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে বিশেষত: পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম (উপজাতীয়) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী কার্যকরকরণ এবং এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিতকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ; আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ ও পুনর্বাসন; সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার; অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিলকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরীতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ; চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ সংশোধন; সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান এখনো কাঙ্খিত পর্যায়ে অগ্রগতি লাভ করেনি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৩ বছর ৮ মাস, এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে ৫ বছর এবং গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর ৬ মাস মোট ৯ বছরের অধিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির উল্লেখিত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে চুক্তি-পূর্ব অবস্থার মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বক্ষেত্রে এখনো সেনা কর্তৃত্ব বজায় রয়েছে। জুম্ম জনগণের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন-নিপীড়ন এখনো পূর্বের মতো অব্যাহত রয়েছে। ফলে জুম্ম জনগণ চরম নিরপত্তাহীন অবস্থায় বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। অপারেশন উত্তরণের ছত্রছায়ায় ও সাধারণ প্রশাসনের সহায়তায় উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও সেটেলার বাঙালিরা জুম্মদের জায়গা-জমি জবরদখল করার লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে গত ৫ জুলাই ২০১৪ সফররত পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্যদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়। মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাসহ সারাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। সারাদেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর সাম্প্রদায়িক হামলা, তাদের জায়গা-জমি জবরদখল, নারীর উপর সহিংসতা ও ধর্মীয় পরিহানি ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্যাম্প সম্প্রসারণ, অবৈধভাবে ইকো-পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, উন্নয়নের নামে অস্থানীয় প্রভাবশালী বাঙালিদের নিকট ভূমি ইজারা প্রদান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা ইত্যাদির নামে জুমভূমিসহ স্থায়ী অধিবাসীদের রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জায়গা-জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে তাদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। পাশাপাশি জুম্মদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর হামলা ও হত্যা, জুম্ম নারীদের অপহরণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। পক্ষান্তরে চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবাধে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাস চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ত্রাসের রাজত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসী ও দেশের নাগরিক সমাজসহ দেশে-বিদেশে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এমনিতর এক জটিল ও নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না করে একতরফাভাবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং জনমতের বিপরীতে রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে যা সরকারের চরম অগণতান্ত্রিক, জনবিরোধী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী মানসিকতারই প্রতিফলন বলে নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ এর ৫৩(১) ধারায় উল্লেখ আছে যে, “সরকার আঞ্চলিক পরিষদ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে কোন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করিলে আঞ্চলিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সহিত আলোচনাক্রমে এবং আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ বিবেচনাক্রমে আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে”। কিন্তু সরকার রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০১, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪ প্রণয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা বা পরামর্শ গ্রহণ করেনি। এটা সরকারের সরাসরি আইন লঙ্ঘন ও আইনের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা। আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ ব্যতিরেকে যে কোন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও পদ্ধতি-বহির্ভূত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ব্যতিরেকে অন্তর্বর্তী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্য থেকে ১১ সদস্যে বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪’, ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪’ এবং ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪’ নামে তিনটি বিল গত ১ জুলাই ২০১৪ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন এবং যাচাইয়ের জন্য সেদিন উক্ত বিলসমূহ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। উক্ত বিলের উদ্দেশ্য ও কার্য-সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয় যে, ‘…পার্বত্য জেলা পরিষদে ছোট-বড় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ও অ-উপজাতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বিধি মোতাবেক অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের গঠন চেয়ারম্যানসহ মাত্র ৫ (পাঁচ) জনে সীমাবদ্ধ হওয়ায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহের কোন প্রতিনিধি দীর্ঘদিন যাবত ….পার্বত্য জেলা পরিষদে নেই। এতে প্রতিনিধি বঞ্চিত নৃ-গোষ্ঠীসমূহের অধিকার খর্ব হচ্ছে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রাধিকার নির্ধারণে তাঁদের কোন ভূমিকা থাকছে না।’ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী পরিষদের সদস্য-সংখ্যা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনে এ সংশোধনী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বশীল ৩৪ সদস্য-বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন না করে কেন অগণতান্ত্রিক পথে অনির্বাচিত বা মনোনীত পরিষদ গঠন করছে তা বিবেচ্য বিষয়।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে ১৯৯২ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও পরবর্তী ২২ বছর ধরে কোন সরকার এ পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি এবং এলক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়নেরও কোন উদ্যোগ নেয়নি। যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় সেই ক্ষমতাসীন দল তাদের দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়ে অন্তর্বর্তী জেলা পরিষদসমূহ অগণতান্ত্রিকভাবে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত করে আসছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় বস্তুত: ৫-সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদসমূহের জনগণের কাছে কোন দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নেই। ফলে এসব পরিষদ এ যাবৎ ক্ষমতাসীন দলের লোকদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ না নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নামে সরকার অন্তর্বর্তীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আজ অবধি ২২ বছর ধরে অনির্বাচিত পরিষদ দিয়ে অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে পার্বত্য জনগণকে তাঁদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করে আসছে, তাহলে সরকার আর কতদিন পর্যন্ত এ রকম অনির্বাচিত পরিষদ চাপিয়ে দিয়ে পার্বত্যবাসীকে তাঁদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখবে?
বস্তুত: তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনকে অব্যাহতভাবে পাশ কাটানো, পার্বত্য জনগণের ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্বের মতো রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার হীন উদ্দেশ্যে সরকার তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মনে করে। বলাবাহুল্য শক্তিশালী ও গতিশীল পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, পরিষদে সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি জনমুখী, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত পার্বত্য জেলা পরিষদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ৩৪ সদস্য-বিশিষ্ট নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য জেলা পরিষদের কোন বিকল্প নেই। অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার যতই বাড়ানো হোক না কেন তাতে করে কখনোই শক্তিশালী, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক পার্বত্য জেলা পরিষদ গড়ে উঠতে পারে না বা সকল জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতে পারে না। বস্তুত: অন্তর্বর্তী পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার বাড়ানো হলে সুবিধাবাদী ও কায়েমী স্বার্থান্বেষীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছুই সাধিত হবে না। পক্ষান্তরে এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে এবং পার্বত্যবাসীদের প্রতি বঞ্চনা ও অবহেলা অধিকতর পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মনে করে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ ব্যতিরেকে “রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১” প্রণয়ন করে। একইভাবে আঞ্চলিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়াই সরকার অতি সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনেরও উদ্যোগ নেয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন নি:সন্দেহে একটি জনমুখী উদ্যোগ বলে বলা যেতে পারে। উচ্চ শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির উন্নতি হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জুম্ম (উপজাতীয়) অধ্যুষিত একটি বিশেষ শাসিত অঞ্চলে এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পার্বত্যাঞ্চলের স্বতন্ত্র বিশেষ প্রেক্ষাপট কতটুকু বিবেচনায় নেয়া হয়েছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা, স্বাতন্ত্র্যতা, জাতিবৈচিত্র্যতা, পশ্চাদপদতা, ভূমি সমস্যা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটের কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ পরিচালনা বোর্ড গঠন, ছাত্রছাত্রী ভর্তি, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ইত্যাদি এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইনে বা নীতিমালায় কতটুকু আমলে নেয়া হয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ স্থাপন করার মতো পার্বত্যবাসীর রাজনৈতিক-সামাজিক-শিক্ষাগত অবস্থা অনুকূল কিনা তা বিবেচ্য বিষয়।
বলাবাহুল্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে কোন আইন প্রণয়নের বেলায় আঞ্চলিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শক্রমে প্রণয়নের যে সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা রয়েছে সরকার উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উক্ত বিধানের কোন তোয়াক্কাই করেনি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা, স্বাতন্ত্র্যতা, জাতিবৈচিত্র্যতা, পশ্চাদপদতা, ভূমি সমস্যা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটের কথা বিন্দুমাত্র আমলে নেয়নি। দেশে বিদ্যমান অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ৫নং ধারায় বলা হয়েছে, যে কোন জাতি, ধর্ম, গোত্র এবং শ্রেণীর পুরুষ ও নারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে আদিবাসী ও স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য আসন সংরক্ষণের কোন বিধান বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত বিশেষ অঞ্চলের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। প্রস্তাবিত রাঙ্গামটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুম্ম তথা স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য সংরক্ষণের কোন বিধান উল্লেখ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী সংস্থা ‘রিজেন্ট বোর্ড’ গঠনেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব তথা জুম্ম ও স্থায়ী অধিবাসীদের থেকে সদস্য নিয়োগের সুনির্দিষ্ট কোন বিধান রাখা হয়নি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ন্যায় সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থীর যোগান দেয়ার মতো পার্বত্যবাসীর অর্থনৈতিক-সামাজিক-শিক্ষাগত ভিত্তি এখনো গড়ে উঠেনি। স্বভাবতই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালা অনুসারে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হলে ৯০% এর অধিক আসনে বহিরাগত ছাত্রছাত্রী ভর্তি হবে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো কাপ্তাই সুইডেন পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে এটি স্থাপিত হলেও বর্তমানে ৯০% এর অধিক ছাত্রছাত্রী বহিরাগত। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে একই অবস্থা সৃষ্টি হবে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ হয়ে দাঁড়াবে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ কেন্দ্রে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্বীকৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন্ করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহিরাগতদের ক্রমাগত অভিবাসন ও ভূমি বেদখল হওয়ার কারণে জুম্মদের জীবন-জীবিকা, পেশা ও ভূমি সংকট অত্যন্ত প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাদি আরো জটিলতর হতে পারে বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মনে করে। এটা জুম্ম ও স্থানীয় অধিবাসীদের পূর্বাবহিতকরণ পূর্বক সম্মতি ব্যতিরেকে তাদের নিজস্ব জায়গা-জমি ও বসতবাটি হতে উচ্ছেদকরণ দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধানাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বিবেচনা করা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত পাহাড়িদের জন্য সরকারী চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখা, উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাহাড়ি ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করা, বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বৃত্তি প্রদান করার বিধান রয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রসার ও উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-উত্তর কালেও উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি সাধিত হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় তিনটি সরকারী কলেজ রয়েছে এবং এসব কলেজে মাত্র কতিপয় বিষয়ে অনার্স পড়ার সুয়োগ রয়েছে। শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত কম। সর্বোপরি সরকারী কলেজসমূহে শিক্ষার উপকরণসহ শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের আবাসনের সমস্যা প্রকটভাবে বিদ্যমান। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলার বেসরকারী কলেজসহ পার্বত্য অঞ্চলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। শিক্ষকের স্বল্পতা, শিক্ষা উপকরণের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক অস্বচ্ছলতা ইত্যাদি কারণে বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
তাই এই মুহূর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় আদিবাসীদের অধিকার ও অস্তিত্বকে বিপন্ন করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অনিশ্চিত রেখে সরকারের এই উদ্যোগ অত্র এলাকার জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত হতে পারে না। অতএব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন না করে তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যমান তিনটি সরকারী কলেজে অধিক সংখ্যক বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্স চালু করা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে আদিবাসী জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের জন্য অধিকতর কোটা বরাদ্দ করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্যারা-মেডিকেল ইনস্টিটিউট স্থাপন, পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে অধিকতর অর্থ বরাদ্দ করা ইত্যাদি উদ্যোগ নেয়া বাস্তবসম্মত বলে জনসংহতি সমিতি মনে করে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ ব্যতিরেকে গত ১ জুলাই ২০১৪ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ পাশ করেছে। এই আইনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। বস্তুত: পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার মূল প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে জেলা পর্যায়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং অঞ্চল পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ প্রণয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার কাঠামোকে নি:সন্দেহে ক্ষুন্ন করবে এবং প্রশাসন ও উন্নয়নে জটিলতা সৃষ্টি করবে।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২২(ক)(গ) ধারা মোতাবেক আঞ্চলিক পরিষদ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধানের বিধান রয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অর্পিত দায়িত্ব পালন করার বিধান থাকলেও উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বরাবরই উক্ত বিধান অবজ্ঞা করে চলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বোর্ডের মূল নির্বাহী পদে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সার্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে সরকারী আমলারাই মূলত: সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন যাদের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। তার অর্থ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নের মূল দায়িত্ব সরকারী আমলাদের হাতে থেকে যাচ্ছে যা পার্বত্য চট্টগ্রামে গণমুখী ও সুষম উন্নয়নে তথা পার্বত্য জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থায় চরমভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও সরকার এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সরকার পূর্ববর্তী মেয়াদের (২০০৯-২০১৩) শেষ পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৩ বিল ৯ম জাতীয় সংসদে উত্থাপন করলেও অবশেষে তা সংসদীয় কমিটিতে ঝুলিয়ে রেখে দেয়। অপরদিকে গত ১-৩ জুলাই ২০১২ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার ও প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর অনুষ্ঠিত এক সভার মাধ্যমে অহস্তান্তরিত বিষয়সমূহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিলেও তাও অকার্যকর অবস্থায় রেখে দেয়া হয়েছে। ঝুলিয়ে রাখা উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার উল্টো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও পার্বত্যাবাসীর আশা-আকাঙ্খার বিপরীতে এই অগণতান্ত্রিক ও জনবিরোধী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে তার জন্য যে কোন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ঘোষণা করছে এবং সেই সাথে সাথে নি¤েœাক্ত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে-
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা;
২. তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা এবং এ লক্ষ্যে অচিরেই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন বিধিমালা ও স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন করা;
৩. তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে জেলার আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণ, পুলিশ (স্থানীয়), ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, স্থানীয় পর্যটনসহ অন্যান্য অহস্তান্তরিত সকল বিষয় নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা;
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি এবং ৩০ জুলাই ২০১২ তৎকালীন আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্ত:মন্ত্রণালয় সভায় চূড়ান্তভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৩-দফা সংশোধনী প্রস্তাব মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধন করা;
৫. ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী সেনা, আনসার, এপিবি ও ভিডিপি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা এবং এ লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা;
৬. আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ ও পুনর্বাসন করা;
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এর সাথে সঙ্গতি রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য সকল আইন ও বিধানাবলীর সংশোধন করা;
৮. জাতীয় সংসদে উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪ বিল প্রত্যাহার করা;
৯. পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ বাতিল করা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বিলুপ্ত করা;
১০. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ স্থগিত রাখা;
১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সরকারী কলেজে অধিকসংখ্যক বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্স চালুসহ পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা;
১২. দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীদের অধিক সংখ্যক কোটা সংরক্ষণ করা এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণাসহ উচ্চ শিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান করা;
১৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে প্যারা-মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা;
১৪. তিন পার্বত্য জেলার সরকারী ও বেসরকারী প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ স্তরে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, শিক্ষকদের আবাসন ও ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেলসহ অবকাঠামো নির্মাণ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা;
১৫. ক্যাম্প সম্প্রসারণ, অবৈধভাবে ইকো-পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, অস্থানীয়দের নিকট ভূমি ইজারা প্রদান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা, বহিরাগতদের পুনর্বাসন ইত্যাদির নামে জুমভূমিসহ স্থায়ী অধিবাসীদের রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জায়গা-জমি অধিগ্রহণ ও বেদখলের প্রক্রিয়া বন্ধ করা;
১৬. সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য অচিরেই ভূমি কমিশন গঠন করা;
১৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নির্মূল করা।
পরিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও জনবিরোধী সকল কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে অধিকতর ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আপামর জুম্ম জনগণ এবং দেশের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সমাজসহ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনসমূহকে আহ্বান জানাচ্ছে।
আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
(জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 1,102 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen