শিরোনামঃ

কোন পথে পাহাড়ের রাজনীতি? প্রদীপ চৌধুরী

সমতলের রাজনীতি কখনো কখনো জোয়ার-ভাটার মতো উষ্ণ-শীতল থাকে। অন্তত: স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্বেও আমরা তাই দেখে আসছি। কিন্তু পাহাড়ের রাজনীতি কখনোই খুব বেশি সময়ের জন্য স্থিতিশীল-সংঘাতহীন ছিল; এমন নজির গৌণই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি ও তার পূর্নগঠনের মাত্র পৌণে চার বছরের মাথায় স্বাধীনতার মহানায়ক- বাংলা জাতিরাষ্ট্রের স্থপতি এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার-স্বজনসহ অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রের সামরিক পরিচালনা শক্তি ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়কে দায়মুক্তিই শুধু দেয়নি; স্বীকৃত-চিহ্নিত হত্যাকারীদের অভিসিক্ত করেছিলো। মূলত: তখন থেকেই আমাদের প্রিয় ভৌগলিক মানচিত্রে ‘দায়মুক্তি’র কালো তিলক স্থান করে নেয়। এর পরে জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যা, মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীর সেনানীকে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে হত্যার ঘটনা; আমাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চরম বিচারহীনতা’র সংস্কৃতির উত্তরসূরী করে তোলে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৭ সালে পাহাড়ে শান্তি স্থাপনের লক্ষে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ সম্পাদন করেন। তাঁর সদিচ্ছায় দেশি-বিদেশি নানামুখী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সূচিত হয়। যা এখনো অব্যাহত আছে। এতোসব উন্নয়ন সত্বেও পাহাড়ে তৃণমূল ও প্রান্তিক মানুষের প্রত্যাশিত শান্তি আসেনি। সম্প্রদায়গত সহিষ্ণুতা, রাষ্ট্রের প্রতি ন্যায়ানুগ ভালোবাসা এবং জায়গা-জমির বিরোধ মেটেনি।
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে যখন অমাবশ্যা নামে তখন তো আর পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণিমার আলো ঝলকানি দেবে, এমন তো নয়। ১৯৭৬ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের তিন পার্বত্য জেলায় যেসব ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনটিরই পরিচ্ছন্ন-গ্রহণযোগ্য তদন্ত হয়নি। কোন কোন ঘটনাতে বিচার প্রার্থীও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে ধারা এখনো বিদ্যমান।
একজন সাধারণ সংবাদকর্মী হিসেবে ব্যর্থতার দায় নিয়েই বলছি, পাহাড়ে ঘটে যাওয়া এবং চলমান কোন ঘটনারই নির্মোহ-নিরপেক্ষ প্রতিফলন গণমাধ্যমে ঘটে না। কোন কোন সময় দায়িত্বশীল কোন কর্তৃপক্ষই দায় স্বীকার করেন না। ফলে অনেক সময় ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’এ চলা প্রচার-অপপ্রচারই সংবাদ ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। তাই অনেক সময় কোন প্রকাশিত-প্রচারিত খবর অন্ধকার কক্ষে সার্কাসের সুতার ওপর চলে যাওয়ার মতো হয়ে উঠে।
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ উত্তর দুই দশকের বেশি সময়ে সমস্যার ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে। চুক্তি’র পক্ষে-বিপক্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে শত শত মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভেছে অকালে। পিতৃহীন, স্বামীহীন, স্বজনহারা মানুষের মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। খুন-অপহরণ-চাঁদাবাজি-অগ্নিসংযোগ নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কী পাহাড়ি-কী বাঙালি, কেউই এই রুদ্ধশ^াসকর পরিস্থিতিতে স্বস্তিবোধ করছে না। অথচ, চুক্তি বাস্তবায়নের নামে, অবস্থার স্বাভাবিকতার নামে এবং শান্তি-সমৃদ্ধি বিনির্মাণের নামে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা অপচয় হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন জবাবদিহিতা নেই। একাধিক প্রশাসনের উপুর্যপরি কর্তৃত্ব জাহিরের যাঁতাকলে মানুষ সেবার চেয়ে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে বেশি। স্বার্থান্বেষী মানুষরা সময়ে-অসময়ে নানা নামে ‘কনডম অর্গানাইজেশন’ গড়ে তুলছেন। স্বার্থ ফুরোলেই তা ভাগাড়ে ছুঁড়ে মারছেন।
মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য কর্মসংস্থান, শান্তিতে-স্বস্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা নিয়ে কারো কোন কণ্ঠ নেই। একটি রাষ্ট্রের একটি বিশেষ এলাকায় এই অসহায় পরিস্থিতির দায় আসলে কার? আমার সাধারণ জানা মতে, আইনের যথাযথ প্রতিপালনের মাধ্যমেই এর সমাধান মিলবে। আইনের শাসন অনুশীলন এবং যেকোন অপরাধকে ‘ধর্ম-সম্প্রদায় এবং রাজনীতি’র উর্ধ্বে রেখে বিচারিক ন্যায্যতাই পাহাড়ের আইন-শৃঙ্খলাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। ‘বিচার মানি তাল গাছ আমার’ এই মানসিকতার নষ্ট মানুষদের প্রভাব কমাতে হবে।
অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’তে এই অঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের সম-মর্যাদায় বসবাসের অধিকারের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি রয়েছে। এই চুক্তি’র দ্রুত সময়ে বাস্তবায়নের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। যাঁরা মনে করে, চুক্তিতে একটি বিশেষ গোষ্ঠিকে প্রাধিকার দেয়া হয়েছে, তাঁদের জন্য আইন-আদালতের পথও খোলা আছে। আবার এটাও বুঝতে হবে, কাউকে দেশান্তরী করে আবার কাউকে অন্য কোথাও পূর্নবাসন করার বাস্তবতা এখন আর নেই। পাহাড়িরা যেমন একাধিকবার উদ্বাস্তু জীবনের খেসারত দিয়েছে, তেমনি বাঙালিদেরও এক প্রজম্ম এখানেই বিকশিত হয়েছে।
যেকোন চুক্তি’র বাস্তবায়ন এবং চুক্তি উত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র পর দায়িত্বশীল সব পক্ষগুলো শক্তিমত্তার প্রদর্শন করেছে। যতোই সময় গড়িয়েছে, সমস্যা বেড়েছে এবং চুক্তি বিরোধী জনমত সংঘটিত হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের মাত্র চার বছরের মাথায় চুক্তি’র সাথে দ্বিমত পোষণকারীরা ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’ ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানের জানান দিতে সমর্থ হয়েছে। এর পরের প্রতিটি সংসদ নির্বাচনের আগে চুক্তি নিয়ে দর কষাকষির রেয়াজ চালু হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তি’র পক্ষ-বিপক্ষের পাহাড়ি সংগঠনগুলোর মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্য রুপ পেয়েছে।
২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চুক্তি স্বাক্ষরকারী ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র একাংশ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)’ গড়ে তোলে। জনসংহতি সমিতি’র সাথে ইউপিডিএফ’র বিদ্যমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতে যোগ হয় নতুন মাত্রা। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর আলোচিত নির্বাচনকে ঘিরে মূল ‘জনসংহতি সমিতি’ এবং ‘ইউপিডিএফ’ কৌশলগত কারণে কাছাকাছি চলে আসে। উল্টোদিকে ‘এম এন লারমা’ অংশের সাথে প্রসিত খীসার ‘ইউপিডিএফ’র তিক্ততা বাড়তে থাকে। এবং মূল ‘ইউপিডিএফ’ ও মূল ‘জনসংহতি’ উভয়পক্ষ মিলে ‘এম এন লারমা’ অংশকে যৌথভাবে মোকাবিলায় উঠে পড়ে লাগে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে শুরু আরো একটি ভিন্নতরো খেলা। গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রসিত বিকাশ খীসা’র নেত্বত্বাধীন ‘ইউপিডিএফ’র বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ নাম নিয়ে তৎপরতা শুরু করে। এরিমধ্যে তাঁরা গত ২ জানুয়ারি ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমাকে দিনে-দুপুরে খাগড়াছড়ির শহরের বাড়ির কাছে গুলিতে প্রাণ হারান । হতাহত হয়েছে আরো বেশ কয়েকজনকে। গত ১৮ মার্চ তাও দিনের আলোতে রাঙামাটির কুতুকছড়ি বাজার এলাকায় সশস্ত্র মহড়ার মাধ্যমে ইউডিপিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই শীর্ষ নেত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব ঘটনায় ইউপিডিএফ প্রকাশ্যে এবং আইনীভাবে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা’র সাথে যাঁদের অভিযুক্ত করছে, তাঁরা সবাই জনসংহতি (এম এন লারমা)’ অংশের প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য শীর্ষ নেতা।
পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ধরে নিতে পারি, আগামী নির্বাচনের সময় যতোই ঘনিয়ে আসবে মূল ইউপিডিএফ’র সাথে বর্মা নেতৃত্বের ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ এবং ‘এমএন লারমা’ অংশের যৌথ সংঘাত মাত্রা ছাড়ানোর আশংকা রয়েছে। এরিমধ্যে তার আলামতও রয়েছে। তার বিপরীতে মূল ‘জনসংহতি’ আর মূল ‘ইউপিডিএফ’র অপ্রকাশ্য সহাবস্থান কোথায় গিয়ে দাড়ায়, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
মিঠুন চাকমা হত্যা এবং দুই নেত্রী অপহরণের ঘটনা দুটি দেশে-বিদেশে আলোচিত হলেও কার্যত আইন ও শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ব্যত্যয় প্রতিফলিত হচ্ছে। কারণ, বড়ো অপরাধের ক্ষেত্রে যখন আইন প্রতিপালনের নজির স্থাপিত হয়না তখন ছোট অপরাধকেও মানুষ ন্যায়সম্মত মনে করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান এই সংস্কৃতি পাহাড়ি-বাঙালি সবার মাঝে দেশ-সমাজের প্রতি উন্নাসিক-উদাসীন এবং নৈরাশ্যতা সৃষ্টি করছে। ‘অপরাধের রাজনৈতিকীকরণ’, ‘অপরাধের সাম্প্রদায়িকীকরণ’ এবং অপরাধকে অস্বীকার করার মানসিকতা অবিবেচনাপ্রসূত।
দেশের কৃষি-পর্যটন-প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ-অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সম্ভাবনাময় একটি বিশেষ অঞ্চলকে ‘বিচার বর্হিভুত’ অথবা ‘অবদমনমূলক’ বিবেচনায় নিলে ভালো ফল বয়ে আসবে না। এখানকার সমস্যা ও সম্ভাবনাকে নির্মোহ-ন্যায্যতার দৃষ্টিতে অনেক বিষয়েই ভালো উদাহরণ দেখা দিবে। অন্তত: অতীতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর অভিজ্ঞতার বিজ্ঞান ও মানবিক বিচার তলিয়ে দেখলেও বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠবে।

 

প্রদীপ চৌধুরী: পাহাড়ের সংবাদকর্মী।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 227 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen