শিরোনামঃ

সবার দৃষ্টি ফ্যাক্স বার্তার দিকে

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে কারা আসছেন

সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। গতকাল রোববার ২৩ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ৩ পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্য হওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা নড়ে চড়ে বসেছেন। চেয়ারম্যান ও সদস্য হওয়ার জন্য লবিং জোর লবিং চলছে। RCHD-Babon
সবার দৃষ্টি এখন ফ্যাক্স বার্তার দিকে। কে হচ্ছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ৮ম চেয়ারম্যান ? কার ভাগ্যে জুটছে চেয়ারম্যানের মনোনয়ন। ফ্যাক্স বার্তায় কার নাম আসছে ? ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে থেকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পদে বাধ্যবাধকতা থাকায় সবার দৃষ্টি এখন এই সৌভাগ্যবান উপজাতীয় ব্যক্তিটির দিকে। অত্যন্ত ক্ষমতাধর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আওয়ামীলীগের মধ্যকার উপজাতীয় নেতাদের মধ্যে তোড় জোড় শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা পরিষদের মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের কর্ম পরিধি ও ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের রয়েছে অসীম ক্ষমতা। এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ যে ক্ষমতা ভোগ করেন অনেক ক্ষেত্রে কোন কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাও এই ক্ষমতা পান না। ১৯৮৯ সনে গঠিত তৎকালীন স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে গৌতম দেওয়ানকে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেয়া হলেও তাঁর স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পর কয়েকজন চেয়ারম্যান এই পদমর্যাদা ভোগ করলেও পরবর্তীতে চেয়ারম্যান এর উপমন্ত্রীর পদ মর্যাদা প্রত্যাহার করে পরিষদ চেয়ারম্যান কে অপরাপর পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ মর্যাদায় নিয়ে আসা হয়। তবে পদমর্যাদার পরিবর্তন হলেও ক্ষমতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। ইউএনডিপির সৌজন্য উপহার হিসেবে কোটি টাকার অত্যাধুনিক পাজেরো ছাড়াও চেয়ারম্যানের একাধিক গাড়ী, পুলিশ পাহাড়া, পরিষদের কাছে হস্তাস্তরিত ২৩টি সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি সহ চতুর্থ, তৃতীয় ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়োগ, বদলী, সব ক্ষমতাই চেয়ারম্যানের। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়নাধীন সিএচটিডিএফ প্রকল্পের একাধিক কম্পোনেন্ট এর পরিচালনার দায়িত্বভার জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত তাই ক্ষমতাধর এই চেয়ারম্যানের চেয়ারের দিকে সবার দৃষ্টি।
১৯৮৯ সনের ৯ জুলাই প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে তৎকালীন স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এই পর্যন্ত পরিষদের একমাত্র নির্বাচিত চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান। একই সাথে দায়িত্ব নেন বিভিন্ন সম্প্রদায় হতে নির্বাচিত ৩২ জন সদস্য। ১৯৯২ সালের ২০ মে রাঙামাটিতে সংঘটিত একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে স্বেচ্ছায় চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন গৌতম দেওয়ান। সে সময় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে গৌতম দেওয়ানের পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহারের জন্য অনেকবার অনুরোধ করার পরেও গৌতম দেওয়ান পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় ১৯৯২ সনের ১৭ জুন তার পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় চেয়ারম্যান পদে ফ্যাক্সযোগে মনোনয়ন কার্যক্রম। তৎকালীন পরিষদ সদস্য এবং পরে বিএনপি’তে যোগদানকারী পারিজাত কুসুম চাকমা ১৭ জুন ১৯৯২ সনে প্রথম ফ্যাক্স চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন পান। ১৫ ফেব্রুয়ারি’৯৬ সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে পারিজাত কুসুম চাকমা বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করার পর সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করার জন্য ৯৬ সালের ৪ মার্চ পদত্যাগ করেন। এর পরিষদের সদস্য রবীন্দ্র লাল চাকমা দ্বিতীয় ফ্যাক্স চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। ৯৬ এর ২০ মার্চ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে স্বল্প সময় দায়িত্বভার পালনের পর ৯৭ সনের ৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ৯৬ সনের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে পরিষদের ৪র্থ ফ্যাক্স চেয়ারম্যান হিসেবে ৯৭ সনের ৫ আগষ্ট মনোনয়ন পান আওয়ামীলীগ নেতা চিংকিউ রোয়াজা। আওয়ামীলীগের শাসনামলের পুরোটা সময় চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার পালনের পর ২০০১ সালে তা বিএনপি সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসলে তৎকালীন পার্বত্য উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ানের একক পছন্দে ৫ম ফ্যাক্স চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন পান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রীধারী ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডীন ড. মানিক লাল দেওয়ান। বিএনপি’র পুরোটা সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর পছন্দের চেয়ারম্যান হিসেবে ৬ষ্ঠ ফ্যাক্স চেয়ারম্যান পদ আসনে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জগৎ জ্যোতি চাকমা। ১৫ জুলাই ২০০৭ সালে দায়িত্বভার গ্রহণের পর ২৫ মে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতার মসনদে আসীন হলে ভাগ্য খুলে যায় দীপংকর তালুকদারের অত্যন্ত আস্থাভাজন আওয়ামীলীগের রাজনীতির শুভাকাংখী সদস্য নিখিল কুমার চাকমার। ২৫ মে ২০০৯ সালে ৭ম চেয়ারম্যান হিসেবে ফ্যাক্স বার্তায় নাম আসে তার। এখনো অবদি ৫ বছরের অধিক সময়কাল ধরে তিনি ক্ষমতায় আছেন। অপেক্ষায় আছেন পরবর্তী ফ্যাক্স বার্তার । জোর গুঞ্জন আছে পরিষদের ৮ম চেয়ারম্যান হিসেবেও তার নাম আসতে পারে।
আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব¡ দেয়া হতো সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের মতামতকে। তবে এবার সংসদ নির্বাচনে পরাজয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে না থাকায় চেয়ারম্যান মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত কতটা প্রাধান্য পায় সেটি প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। তবে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য মনোনয়নে দীপংকর তালুকদারের সমর্থন পেয়ে ফিরোজা বেগম চিনু মনোনয়ন পাওয়ায় এখনো তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি অটুট রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাঙামাটি জেলা পরিষদের ৮ম চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয়ভাবে যার নাম সর্বাধিক উচ্চারিত হচ্ছে তিনি হচ্ছেন জেলা পরিষদের বর্তমান সদস্য আওয়ামীলীগের কাউখালী উপজেলা সভাপতি অংশী প্রু চৌধুরীর। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার প্রায় উপজেলায় যেখানে দীপংকর তালুকদার পরাজিত হয়েছেন সেখানে অংশি প্রুর কাউখালী উপজেলায় তিনি সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন। এছাড়া কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অংসুইসাইন চৌধুরী, উন্নয়নকর্মী মংথোয়াই চিং, আওয়ামীলীগ নেতা ক্যারল চাকমা, সন্তোষ চাকমা সহ আরো নাম উচ্চারিত হচ্ছে। তবে সবকিছুই এখন শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ। অপেক্ষার অবসান হবে ফ্যাক্স বার্তায়। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমাও জোর লবিং করছেন স্ব পদে থাকার জন্য তার সম্ভাবনাও রয়েছে। সম্প্রদায়গত হিসেবে বান্দরবানে মারমা, খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা এবং রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায় থেকে চেয়ারম্যান হওয়ার কথা, কিন্তু বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে মারমা সম্প্রদায় থেকে চেয়ারম্যান থাকায় রাঙামাটি থেকে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী চাকমা থেকে চেয়ারম্যান না দিলে সম্প্রদায় গত বৈষম্যে সৃষ্টি হতে পারে। তাই রাঙামাটি থেকে চাকমা সম্প্রদায় থেকে চেয়ারম্যান দিলে নিখিল কুমার চাকমার থাকার সম্ভাবনা বেশী।RHDC

সদস্য পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে

এদিকে চেয়ারম্যানগণের পাশাপাশি পরিষদের সদস্য পদে কোন ১০ জন আসছেন – সেটা নিয়েও চলছে জোর লবিং। বিশেষ করে জেলা পরিষদের আইনের ১৬(ক) ধারায় অন্তবর্তীকালীন পরিষদের সদস্য সংখ্যা চেয়ারম্যানসহ ১৫ জনে পরিবর্তন পূর্বক আইন পাশ হওয়ায় সদস্য ৪ জনের স্থলে ১৪ জন সদস্যের সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে অনেকের মনেই পরিষদ সদস্য হওয়ার আশা সঞ্জারিত হয়েছে।
অনুমোদিত ১৪ সদস্যের মধ্যে বাঙ্গালী সদস্য হিসেবে জেলা আওয়ামীলীগের সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুছা মাতব্বর, সাবেক জেলা কমিটির সম্পাদক হাজী মোঃ কামাল উদ্দিন, আব্দুল মতিন, জাকির হোসেন চৌধুরী, রফিক আহমেদ তালুকদার, জাহিদুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান মুজিব, লংগদু আওয়ামীলীগ নেতা আব্দু রহিম, কাপ্তাই আওয়ামীলীগ নেতা মফিজুল হক, কে.এম. জসিম উদ্দিন বাবুলের নাম শোনা যাচ্ছে। অপরদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসক্লাবের সভাপতি সুনীল কান্তি দে, প্রধান শিক্ষক বাদল চন্দ্র দে, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অমর দে ও বিজয় রতন দের নাম শোনা যাচ্ছে।
জেলা পরিষদের মহিলা সদস্য হিসেবে অপহৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র তংচংগ্যার স্ত্রী সবিতা চাকমা এগিয়ে আছেন। পাশাপাশি পৌর কাউন্সিলর জেবুন্নেসা রহিম, রোকসানা আক্তার, মনোয়ারা বেগম, জয়তুন নুর, লংবিতা ত্রিপুরা, কৃষ্ণা দেব এর নাম শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া পাহাড়ী কোটা থেকে স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা, মিন্টু মারমা, অভয় প্রকাশ চাকমা, আশীষ কুমার চাকমা নব, সদানন্দ চাকমা, বিলাইছড়ি উপজেলার পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়সেন তংচংগ্যা, অংছা প্রু মারমা, সুনীল কান্তি তংচংগ্যা, মনোজ বাহাদুর, ঊষাং মারমা, উবাচ মারমা, মৃনাল তংচঙ্গ্যা।
এছাড়া জনসংহতি সমিতির পছন্দের লোকজন থাকতে পারে। তবে দলীয় নেতা কর্মীদের দাবী ত্যাগী ও গ্রহনযোগ্য নেতাদের যেন মনোনয়ন দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, উল্লেখ্য গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভা অর্ন্তবর্তকালীর জেলা পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্যসহ ৫ জনের স্থলে ১১জন করার অনুমোদন দেয়। পরে ১১জনের স্থানে ১৫জন করা হয়। পরে ১লা জুলাই এটি সংসদে উপস্থাপন করা হয় এবং স্পিকার সেটিকে যাচাই বাছাই করার জন্য স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করেন। গত ১৭ নভেম্বর সোমবার রাতে কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী তিনটি বিলই সংশোধিত আকারে পাশের প্রস্তাব করে রিপোর্ট উত্থাপন করেন। সবশেষ আজ ২৩ নভেম্বর বিল ৩টি সংসদে পাস হয় ।
সংশোধীত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিলে ১৫ সদস্যের পরিষদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থেকে চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি ১৪ সদস্যের মধ্যে চাকমা চার জন প্রতিনিধি, মারমা দুই জন, খেয়াং ও লুসাই ও পাংখোয়া একজন করে, ত্রিপুরা একজন, তঞ্চঙ্গ্যাঁ একজন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাইরে থেকে তিন জন সদস্য, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাইরে থেকে এক জন মনোনীত নারী সদস্য ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একজন মনোনীত নারী সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 1,227 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen