শিরোনামঃ

জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প: নিষিদ্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময়

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কারণে বিভিন্ন দেশে এবং বিশেষভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি খরচ সর্বোচ্চ হারে বাড়ছে, যার জন্য ভীতিকর হারে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার ও গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির তিনটি প্রধান ধরনঃ কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান দায়ী গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ d886e04b-e9f0-418b-a740-2b0de4b5997b_mw1024_mh1024_sবাড়িয়ে দিচ্ছে।  উপরন্তু, আইপিসিসি রিপোর্ট ২০১৪ মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড,বাইকার্বোনেট ও অম্লতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও কার্বোনেট আয়ন এবং PH হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে, খাদ্য জাল সহ জীবের বাস্তুতন্ত্র ও বায়োগ্যাস উৎপাদনে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্নকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।  অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর কারণে চরমভাবে পরিবেশগত সমস্যা হতে পারে, উদাহরণস্বরূপ বায়ু দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা। উপরন্তু, জীবাশ্ম জ্বালানি কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়াও নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদি নির্গমন করে। ব্ল্যাক কার্বন সাধারণত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর থেকে নির্গত হয় এবং Tiwari et al.(2015) অনুসারে, প্রায় 94% কার্যকর কালো কার্বন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। উপরন্তু,২০০০ সালে, শুধু কয়লা পোড়ানর কারণে বিশ্বে ১২০০০ টন তেজস্ক্রিয় ধাতু এবং ৫০০০ টন ইউরেনিয়াম নির্গত হয়।  যানবাহন, শিল্প কারখানা ও ইটভাটার ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে(খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি) জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের খাগড়াছড়িতে ৫২ টিরও বেশি ইটের ভাটা, বান্দরবানে ৩১টি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার ১৭টি ইটের ভাটা দেখা যায় যেখানে ১৩ টিরও বেশি ইটের ভাটা বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন এলাকায় অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে. মংলা চিন, খাগড়াছড়ি জেলার বাসিন্দা অনুযায়ী,- “অধিকাংশ ইটের ভাটা বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজারের কাছাকাছি অবস্থিত।” স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে, ইটভাটার দ্বারা জীবাশ্ম জ্বালানি বৃদ্ধির জন্য মাটি উৎপাদনশীলতা এবং উর্বরতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। উপরন্তু বায়ু দূষণের কারণে, হাঁপানি, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ব্যাধি এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এই এলাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।  যখন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়, এটা কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে যা বৈশ্বিক উষ্ণতা হিসেবে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে, মেরু বরফ গলতে শুরু ক্রবে এবং বাংলাদেশ নিম্নাঞ্চল এলাকা প্লাবিত হবে। তাছাড়া, ১ বা ২ ডিগ্রী তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশে ৩৫ মিলিয়নের ও অধিক মানুষ তাদের বাস্তুভিটা হারাবে যেখানে এটা অনুমান করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ২০৫০ সালের মাঝে ৩০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চলে দৃশ্যমান হওয়া ছাড়াও,ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে গুরুতর ক্ষতি লক্ষ্য করা গেছে।

চঞ্চল চাকমা, কমলছড়ি সংরক্ষিত বনের একজন বাসিন্দা বিশ্বাস করেন যে, বর্ধিত তাপমাত্রার প্রভাবে ঔষধি গাছপালা, ফলমূল, বাঁশ, বেত, ধর্মীয় বৃক্ষ, প্রাণী প্রজাতি সবকিছুই মারাত্নকভাবে কমে যাচ্ছে।  এসব প্রয়োজনীয় গাছপালার  উৎপাদন যথেষ্ট কমে যাওয়াতে কৃষকেরা বিপাকে পড়ছে। সেই সাথে এখানে সবচেয়ে সহজলভ্য পানির উৎস, পানির ধারা ও ছরার সংখ্যাটা কমে যাচ্ছে, যার কারণে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি দিনে দিনে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ছে। এখন  কমলছড়ি সংরক্ষিত বনের আশেপাশের জলাশয় গুলোতে মাছের সংখ্যাও অনেক কমে এসেছে।

বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মের উপর জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের মারাত্মক প্রভাব নিয়ে সরকারি, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক মহলের এখনি জোর দেয়া ভাবা উচিত। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organization or WHO) তামাক নিয়ন্ত্রণ উপর ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (Framework Convention on Tobacco Control বা FCTC) এর কিছু রীতিনীতি অনুসরণ করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করতে পারিঃ
“…তামাক সেবন এবং তামাক এর সংস্পর্শে আসার কারণে যে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং সামাজিক, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য একটি কাঠামো প্রদানের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন সম্ভব যা নিশ্চিত হবে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক দলগুলোর ক্রমাগত এবং তামাক ব্যাবহার এবং তামাকের ধোঁয়া নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে।”

কিয়টো প্রোটোকল (The Kyoto Protocol) অঙ্গীকার করে যে ক্রোড়পত্র বি এর ৩৯ টি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার কমিয়ে আনার মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাবে। বাংলাদেশের মত গরীব দেশ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী এই শিল্পায়নের গ্যাস নিসরনের প্রভাবের। জীবাশ্ম জ্বালানীর শিল্পের ক্ষতিকর প্রভাবের উপর গুরুত্ব দিয়ে এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয়ও উদ্যোগ গ্রহণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে । উদাহরণ স্বরূপ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা সম্মেলনের ১৮নাম্বার অনুচ্ছেদের ৫ নাম্বার অংশ- পরিবেশ রক্ষা তে বলা হয়েছেঃ

“…পরিবেশ এবং মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার স্বার্থে সব দলকে সম্মত হতে হবে তারা যাতে তামাক চাষ এবং উৎপাদন তাদের নিজেদের সীমানার ভেতরে রাখে।“

উপরন্তু,জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প নিষিদ্ধ করার লক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (United Nations Framework Convention on Climate Change বা UNFCCC) নানা উপায় গ্রহণ করতে পারে, যেমন WHO তামাক শিল্পকে নিষিদ্ধের জন্যে করেছিলেন এবং WHO এর কিছু কার্যক্রমঃ তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে “ট্র্যাক এবং ট্রেস” প্রযুক্তি প্রবর্তন এবং এবং ধূমপান বিরোধী নীতিমালা দৃষ্টিকোণ শাসন খাতে আইনজীবী প্রবৃত্তি, শিল্প ও আইনি কর্তৃপক্ষ মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বড় তামাকের কোম্পানির প্রবেশ সীমাবদ্ধ করা ইত্যাদি।  chennai_pollution_1777000f

যদিও বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের এক বিশাল ভাণ্ডার কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি  । নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানী ভিত্তিক শিল্প বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সহ সব দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। গোটা বিশ্ব ব্যাপী টেকসই পরিবেশ এবং জীবিকা নির্বাহ নিশ্চিত করার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানী ভিত্তিক শিল্প গুলোকে সীমাবদ্ধ করা উচিত ।অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক প্রভাব এড়ানোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত যার জন্য বৈধ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পরিশীলন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: মোঃ আরিফ চৌধুরী, সহযোগী গবেষক, পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, Email: arifchowdhury065@gmail.com,

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 179 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen