শিরোনামঃ

আওয়ামী লীগের গায়ে আরেকটি কলংকের তকমা ও পাহাড়ের নির্বাচন ওয়াদুদ ভূইয়া

অনলাইনে বিভিন্ন খবর দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এই সরকার কী করে ভাবছে, এই একদলীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে? যেই নির্বাচন আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ কিংবা ‘লাঙ্গল মার্কার আওয়ামী লীগ’!001 গতকাল আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা তোফায়েল সাহেব তো বলেই ফেললেন, লাঙ্গলও হাসিনার মার্কা! তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি, লাঙ্গল হাসিনার মার্কা আর নৌকা আওয়ামী লীগের মার্কা? সুতরাং আওয়ামী লীগের মার্কা ও হাসিনার মার্কা দুইয়ে মিলে যে একদল সৃষ্টি করেছে, সেটা তারা নিজেরাই স্বীকার করে নিলেন। সারাদেশ জুড়ে এক অদ্ভুদ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তারা! জনগণকে জোর করে হলেও ভোট কেন্দ্রে নিয়ে তাদের নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা দেখে একাধারে করুনা ও হাসি পাচ্ছে আমার।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, রাশিয়া, জাপান – দুনিয়ার কোন পরাশক্তিই এই তথাকথিত ‘নির্বাচনে’ পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। তাই নির্বাচন কমিশন ঘাঁটের টাকা খরচ করে ভূটান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ থেকে ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’ পর্যবেক্ষনের লক্ষ্যে ভাড়াটিয়া পর্যবেক্ষক আনছে বলে খবরে প্রকাশ! পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে কিংবা পাকিস্তানীদের দোশরদের বিরুদ্ধে এত বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছে সরকার, অথচ নির্বাচন বৈধতার সার্টিফিকেট পেতে পাকিস্তান থেকে পর্যবেক্ষক আনছে কি করে!? এই ঘটনায় পরোক্ষভাবে এই আওয়ামী সরকারও পাকিস্তানের দোসর হয়ে গেল না?! যদি তা তারা স্বীকার না করে, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, এই সরকার পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড রোল প্লে করছে।

এতদসত্বেও যদি জনগণ ভোট দিতে না আসে, তাহলে প্রতিটা কেন্দ্রে ১০০ জন ছাত্রলীগের কর্মী নিজেরাই একেকজন করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে হলেও নির্বাচন গ্রহনযোগ্য করবেন বলে তেনারা প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন! ঘোষণা না দিয়েও বা উপায় কী? যে নির্বাচনে দেশের কোন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহন করছে না, সুশীল থেকে সাধারন মানুষ সমর্থন করছে না। এমনকি জাতীয় পার্টির মত চতুর্থ পর্যায়ের একটি দলের প্রধান এরশাদকে, নির্বাচনে নেওয়ার জন্য, তাঁর স্ত্রীর সাথে সরকার আঁতাত করে, সেনাবাহিনীর হসপিটালে আটক করে রেখেছে। এ নাটকীয়তা তো দেশের সাধারন নাগরিকের কাছেও পরিস্কার। এতে এ নির্বাচনটি জনগনের কাছে আরও অধিক পরিমান অগ্রহনযোগ্য হয়ে পড়েছে। ১৫৪ টি আসনে ইতোমধ্যেই ভোটবিহীন প্রার্থী নির্বাচন হয়ে গেছে। অর্থাৎ ৫২ ভাগ ভোটার ভোট দেবার সুযোগই পাননি। আর ভোট দেবার বাকি থাকে ৪৮ ভাগ ভোটার। তাদের মধ্যে থেকে গড়ে শতকরা ৭০ ভাগ হারে ভোটার উপস্থিতি যদি আমরা বিবেচনা করি, ধরে নিলাম ৪৮ এর বিপরীতে ১৪ ভাগ ভোটার সাধারনতঃ ভোট দিতে যাবেন না। সুতরাং ভোট দিতে যাচ্ছে ৩৪ ভাগ ভোটার। আবার ধরে নিলাম, এর মধ্যে অর্ধেক আওয়ামী লীগের আর অর্ধেক বিএনপি’র ভোটার। বিএনপি ভোট বর্জনের কারনে ধরে নিলাম বিএনপি সমর্থিত এই ৩৪ ভাগের অর্ধেক ১৭ ভাগ ভোটার ভোট বর্জন করবেন। সুতরাং মোট ভোটার উপস্থিতি হতে পারে ৩৪ ভাগের বাকি অর্ধেক ১৭ ভাগ! এর মধ্যে অনেক আওয়ামী লীগ ভোটার প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহই বোধ করছে না। এমনকি আমার সামনে উপস্থিত একজন আওয়ামী লীগার বলেই ফেললেন, তিনিও ভোট দিতে যাচ্ছে না! নতুন ভোটার অনেকেও প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন নির্বাচনে ভোট দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। সুতরাং গানিতিক হিসেবের বাইরে যে আরও কম ভোট কাস্টিং হচ্ছে সেটা স্পষ্ঠ! তবুও আমরা তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম এই ১৭ ভাগ ভোটারই ভোট প্রদান করবেন। এই ১৭ ভাগ ভোটারের উপস্থিতিতে নির্বাচিত ‘সংসদ সদস্য’রা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন! অথচ, সংবিধানে বলা হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। সুতরাং এই নির্বাচন যে সর্বৈব অবৈধ, সংবিধান সম্মত নয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতের কোন ছোঁয়াই এখানে নাই, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! অথচ, হাসিনা আমাদের প্রতিদিন সংবিধানের সবক শেখাচ্ছেন!

আমার নির্বাচনী এলাকা, খাগড়াছড়িতে শুধু গুচ্ছগ্রামে প্রায় ১ লক্ষ ভোটার। তারা রেশনকার্ডধারী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা প্রতিমাসে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যশস্য পেয়ে আসছে। রেশনকার্ডই এসব পরিবারের মূল আয়ের উৎস। রেশনকার্ডের ইতিহাস অনেক বড়, সেখানে আমি যাবো না। ভোট দিতে না গেলে গুচ্ছগ্রামের রেশনকার্ড বাতিল করবে বলে গুচ্ছগ্রামবাসীদের শাঁসাচ্ছে আওয়ামী লীগের পান্ডারা! নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য কি নির্দয় আচরণ! এ কারনে, আমার গুচ্ছগ্রামবাসীদেরকে প্রতিশ্রুতি দিতে ইচ্ছে করছে, যদি ভোট দিতে না যাওয়ার অপরাধে কোন পরিবারের রেশনকার্ড বাতিল করা হয়, এই অতিস্বল্পমেয়াদী সরকারের পর তাদেরকে দুইটি করে রেশনকার্ড দেওয়া হবে। এবং যেই গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প চেয়ারম্যানের অধীনে রেশনকার্ড বাতিল হবে, তাঁর কাছ থেকে ১ টির পরিবর্তে ১০ টি রেশনকার্ড আদায় করা হবে।

যেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া কোন প্রার্থীই নেই, সেরকম একটি একতরফা নির্বাচনেও আমার এলাকার আঞ্চলিক দল জেএসএস (সংস্কারপন্থী – এম এন লারমা) সমর্থিত প্রার্থীর স্ত্রী সহ ৫ জন কর্মীকে অপহরন করা হয়েছে! একদলীয় নির্বাচনে পর্যন্ত তাদের আতংকের শেষ নেই। এই কয়েকদিনের এমপি হতে গিয়েও তারা যেই কামড়াকামড়ি শুরু করেছে, তা রীতিমত তুলনাহীন! এর মাঝে আরেক আঞ্চলিক দল, ইউপিডিএফ শহরে অস্ত্রের মহড়া প্রদর্শন করেছে বলে খবরে প্রকাশ!

আরেকটা ব্যাপার বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে। বড়দলগুলোর অংশগ্রহন না করার কারনে ওয়ান-ইলেভেনের পূর্বে বাতিলকৃত নবম সংসদ নির্বাচন, এরশাদের ‘৮৮ এর নির্বাচন, ‘৯৬ এর নির্বাচনে কোন আঞ্চলিক সশস্ত্র দল অংশ নেয়নি। কিন্তু এবার প্রায় সকল রাজনৈতিক দল সহ দেশি-বিদেশি সকল অঙ্গন থেকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা এলেও, কোন আশায় যে এবার এই দলগুলো রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং নিজেদের মধ্যে হানাহানি করছে, ভোটারদের উপস্থিতি ও নিজেদের পক্ষে ভোট আদায়ের জন্য অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না!

আমার এলাকার মোট ১৮১ টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৫৯ টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের অফিস থেকে! ইতিমধ্যেই সারাদেশে অনেকগুলো কেন্দ্র পুড়ে যাচ্ছে! এটাই ‘অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনের নমুনা! অথচ, সিইসি বলছে, অবরোধের মধ্যে ভোট দিতে সমস্যা হবে না! তাহলে কি সিইসি স্বীকার করলো, ভোটারবিহীন ভোট করে নেবেন? অন্যদিকে আজকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে! প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য যে কতটুকু হাস্যকর ও এই নির্বাচন কমিশন যে কতটুকু শক্তিশালী তা দেশবাসী ইতোমধ্যেই টের পেয়েছেন। এই নির্বাচনের কারনে আওয়ামী লীগের গায়ে যে আরেকটি কলংকের তকমা পড়ছে সেটা স্পষ্ঠ হতে শুরু করেছে। একতরফা ভোট হয়তো তারা করবে, তবে এই মূর্খতার খেসারত তাদের দিতে হবে ভোট হয়ে যাওয়ার পরেরদিন থেকে।

পশ্চিমা কূটনীতিকেরা তো বটেই প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টারের মত পত্রিকা, যারা আওয়ামী সুশীল বলে ব্যাপকভাবে পরিচিত, তারা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে! সম্প্রতি সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা কতৃক প্রকাশিত একটি মোবাইল কথোপকথনের টেপ থেকে আমরা জানতে পারি, প্রথম-আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদককে থার্ড ক্লাস লোক বলে গালি দিয়েছে! তারা পর্যন্ত নির্বাচন বাতিলের পক্ষে ব্যাপক প্রচারনা চালাচ্ছে! ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ১ জানুয়ারির একটি সম্পাদকীয় লিখেছেন, ‘প্লিজ, নির্বাচন স্থগিত করুন!’

এরপরেও নির্বাচন কমিশন আর আওয়ামী লীগ কী করে দিবাস্বপ্ন দেখছে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে, সেটা বোঝাটাই দুস্কর হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে একজন সাংবাদিকের একটি বিতর্কিত স্ট্যাটাসে একজন সাধারন নাগরিকের মন্তব্য দেখলাম। মন্তব্যটি এরকম- “এই নির্বাচন নিয়ে অহংকার করার কিছু নাই। তারপরও যারা এ নির্বাচন নিয়ে বড় বড় কথা বলছে, তারা সত্যিকার অর্থেই বিবেকহীন!” এই নাগরিকের মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে এই নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীর ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে।

 

ওয়াদুদ ভূইয়া

সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

 

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 340 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen